গ্রাহক কানের রোগসমূহের মধ্যে সচরাচর যে রোগটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তা হচ্ছে কান পাকা রোগ। বাংলাদেশের ৫-১০% অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। এই রোগটি সাধারণতঃ শিশু বয়সে শুরু হয় উপরের শ্বাসনালীর প্রদাহ (এডেনয়েডস, টনসিলাইটিস ইত্যাদি) হতে। এই বয়সে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও থাকে কম। শিশুদের Eustachian tube টি (উপরের শ্বাসনালীর সাথে মধ্যকর্ণের সংযোগনালী) বড়দের থেকে Straight এবংHorizontal থাকে। তাই সহজেই উপরের শ্বাসনালীর প্রদাহ মধ্যকর্ণকে সংক্রমিত করে থাকে। Acute Suppurative Otitis Media বা মধ্যকর্ণে একিউট ইনফেকশনের কারণে মধ্যকর্ণে প্ুঁজ জমে কানে প্রচন্ড ব্যথা হয়, জ্বর আসে, শরীর ম্যাজম্যাজ করে, কানের ব্যথায় শিশুরা রাতে ঘুমাতে পারে না এবং কান্নাকাটি করে। কান পরীক্ষা করলে দেখা যায় যে, কানের পর্দা (টিমপেনিক মেমব্রেন) লাল হয়ে আছে। পরবর্তীতে মধ্যকর্ণে প্রচুর পুঁজ কমে কানের পর্দা ফেটে একসময় পুঁজ পরতে থাকে। পরবর্তীতে কানের পর্দার এই ছিদ্রটি আর জোড়া না লাগলে কান দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজ পরতে থাকে এবং এর সাথে মধ্যকর্ণে অবস্থিত অতিক্ষুদ্র হাড় (মেলিয়াস, ইনকাস ও স্টেপিস) সমূহ ক্ষয় হয়ে যায়। কানের পর্দার ছিদ্র এবং মধ্যকর্ণের হাড়সমূহের ক্ষয়ের ফলে ধীরে ধীরে ঐ ব্যক্তির শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে থাকে। রোগের লক্ষণ: এই রোগের প্রধান দুটি লক্ষণ হচ্ছে (১) কান দিয়ে পুঁজ/পানি আসা এবং (২) কানের শ্রবণ শক্তি হ্রাস পাওয়া। কান দিয়ে অনেক সময় এত বেশি পুঁজ/পানি পড়ে যে রাত্রে ঘুমালে সকালে বালিশ ভিজে যায়। কান দিয়ে পুঁজ পড়ার কারণে এবং তার গন্ধে সমাজে মেলা মেশা কঠিন হয়ে পড়ে। কানের শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়ার ফলে যোগাযোগ রক্ষা করতে না পারায় সে তার চারপার্শ্বের পৃথিবী হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কানের পুঁজ/পানি পরীক্ষা করার পর পরীক্ষা করলে দেখা যায় যে, কানের পর্দায় ছিদ্র আছে। Pure Tone Audiometry পরীক্ষার মাধ্যমে শ্রবণশক্তি হ্রাস এর মাত্রা নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রকার: কান পাকা রোগ দুই ধরনের হয়। একটি Tubotympanic, অপরটি Atticoantral। Tubotympanic রোগে রোগটি ইউস্টেশিয়ান টিউব (নেজোফেরিংক্স এবং মধ্যকর্ণের সংযোগনালী) এবং মধ্যকর্ণের সঁপড়ংধ তে সীমিত থাকে। ফলে কান দিয়ে তরল পানির মত প্রচুর পুঁজ আসে; কানের পর্দার মাঝখানে ছিদ্র থাকে এবং শ্রবণশক্তি কিছুটা হ্রাস পায়। অপরদিকে Atticoantral disease এ কান দিয়ে অল্প দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ আসে যা কোন কোন সময় রক্তমাখাও হতে পারে। এখানে কানের পর্দার ছিদ্রটি উপরের দিকে (Attic Region এবং Marginal) থাকে এবং Cholesteatoma নামক ধ্বংসাত্মক পদার্থ পাওয়া যায় যা মধ্যকর্ণ এবং চতুঃপার্শ্বের সমস্ত Structure কে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে এবং অনেক সময় Brain এর ভিতরও পুঁজ জমতে থাকে। ফলে জীবন মারাত্মক মৃত্যু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। জটিলতা: মধ্যকর্ণের ইনফেকশন বিশেষতঃ Atticoantral disease-এ একদিকে যেমন কান দিয়ে দূর্গন্ধযুক্ত পুঁজ আসে সাথে সাথে বিভিন্ন জটিলতাও দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে অন্যতম হলো (১) শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে পারে, (২) Facial Nerve palsy বা মুখ বাঁকা হয়ে যেতে পারে, (৩) কানের পিছনে ইনফেকশন Mastoiditis হয়ে পুঁজ (Mastoid Abscess) জমতে পারে। (৪) Brain এর ভিতরও পুঁজ জমে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কাজেই এই রোগটি প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করা এবং যথোপযুক্ত চিকিৎসা করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিরোধ: বাচ্চাদের কান পাকা রোগ যেন না হতে পারে সেজন্য অভিভাবকদের করণীয় সবচেয়ে বেশি। বাচ্চাদের যাতে ঠান্ডা না লাগে, ঠান্ডা না খায় সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। শিশুদের গলায় ব্যথা (Tonsillitis) হলে, নাক দিয়ে পানি (Rhinitis) পড়লে, নাক বন্ধ হলে বা ঘুমানোর সময় হা করে ঘুমালে সাথে সাথে নাক, কান, গলার ডাক্তারের পরামর্শক্রমে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। না হলে উপরের শ্বাসনালীর এই সমস্ত ইনফেকশন হতে মধ্যকর্ণের ইনফেকশনও হবে। মধ্যকর্ণের ইনফেকশন প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করলে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় কানের ব্যথা কমে যায়, কান দিয়ে পুঁজ পড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং কানের পর্দা জোড়া লেগে যায়। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে এই স্বল্প মেয়াদী কানের ইনফেকশন অবশেষে দীর্ঘ মেয়াদী কানপাকা রোগে রূপান্তরিত হয়। চিকিৎসা: কান পাকা রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে এন্টিবায়োটিক ইয়ার ড্রপ, মুখে খাবার এন্টিবায়োটিক, এন্টিহিস্টামিন এবং নাকে ড্রপ দেয়া হয়। এই চিকিৎসায় সাধারণতঃ কান দিয়ে পুঁজ পড়া সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কানের পর্দায় ছিদ্রটি ঠিকই থেকে যায়। ফলে কখনো ঠান্ডা লাগলে বা ডুব দিয়ে গোসল করলে মধ্যকর্ণের ইনফেকশনটি (কান পাকা রোগ) পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তাই এ সমস্ত ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার সাথে রোগীদেরকে উপদেশ দেয়া হয়- যাতে ঠান্ডা না লাগায়, ঠান্ডা না খায়, ডুব দিয়ে গোসল না করে ইত্যাদি। রোগীরা উপদেশ মেনে চললে এবং ১ হতে ৩ মাস কান দিয়ে পুঁজ না পড়লে কানের পর্দার ছিদ্রটি Myingoplasty নামক অপারেশনের মাধ্যমে জোড়া লাগানো যায়। তবে Myingoplasty অপারেশনটি সাধারণতঃ ১২ বৎসর বয়সের নিচে করা হয় না। অন্যদিকে Atticoantral disease বা কান পাকা- যে রোগে দুর্গন্ধ বেশি হয় বা Cholesteatoma নামক ধ্বংসাত্মক পদার্থ পাওয়া যায় বা বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দেয় সে সমস্ত ক্ষেত্রে Mastoidectomy নামক অপারেশন করে কানটিকে শঙ্কামুক্ত (Safe) করা হয়।

আপনার কোনো প্রশ্ন আছে?

মায়া অ্যাপ থেকে পরিচয় গোপন রেখে নিঃসংকোচে শারীরিক, মানসিক এবং জীবনধারা বিষয়ক যেকোনো প্রশ্ন করুন, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।


মায়া অ্যাপ ডাউনলোড করুন

প্রশ্ন করুন আপনিও